কপিলেশ্বর শিব মন্দির: যে পাথর স্পর্শ করেছে অষ্টম শতাব্দী
বেলডাঙার কথা বললেই প্রথমে নাম আসে মা দুমনির। কিন্তু এই শহরের বুকে আরেকটি মন্দির আছে, যাকে দেখলে মনে হবে সময় থমকে দাঁড়িয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরব সাক্ষী হয়ে আছে—সেই কপিলেশ্বর শিব মন্দির, শক্তিপুরে।
যাওয়া যায় খুব সহজে। বেলডাঙা শহর থেকে কিছুটা এগোলেই শক্তিপুর। চারদিকে সবুজ, হিজল-বটের ছায়া, শান্ত গেঁয়ো পরিবেশ। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়েই চোখে পড়ে একটা মন্দির। ছোটো। কিন্তু দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা যেন রাজকীয়। পা রাখতেই যেন সময়ের গন্ধ পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিকেরা যা বলেন
শুনতে কি আশ্চর্য লাগে? এই মন্দিরের শিবলিঙ্গের বয়স প্রায় সাড়ে বারোশো বছর! হ্যাঁ, একেবারে অষ্টম শতাব্দী—খ্রিস্টীয় ৮৮৭ সাল। তখন এ দেশে পাল রাজবংশের শাসন। বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের জয়যাত্রা। তবু এখানে তৈরি হয়েছিল এক শিবলিঙ্গ।
এখন প্রশ্ন জাগে—কীভাবে নিশ্চিত হলেন গবেষকেরা? কে বলল এই পাথরটির বয়স এত?
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা নির্ভর করেছেন পাথরের গঠন আর খোদাইশৈলী দেখে। কোষ্টি পাথরের সেই বিশেষ চেহারা। মূর্তির আঙ্গিক। তলায় লেখা কিছু প্রাচীন লিপি (অনেকটা মিলে যায়)। আর অবশ্যই, স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরা গল্প। সব মিলিয়ে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তাঁরা—এই শিবলিঙ্গ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, এটি সেন বা পাল যুগের। সঠিকভাবে বললে, ৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের।
দাঁড়িয়ে দেখছি মন্দিরের ভেতরটা। অন্ধকার প্রকোষ্ঠে শ্বেতপাথরের শিবলিঙ্গ। উপরে গঙ্গাজল পড়ে ফোঁটা ফোঁটা। পুজোর ধূপের গন্ধ নাকে এসে ভর করে। হাত বাড়ালে না হয় পাথর ছুঁয়ে দেখা যায়—এই পাথরেই কি এক হাজার বছর আগে কোনো ভক্ত মাথা ঠেকিয়েছিল? অমুক রাজা এসেছিল নৈবেদ্য দিতে? কে জানে।
বর্তমান মন্দিরের জন্মকথা
যাই হোক, শুধু শিবলিঙ্গ নিয়ে গল্প শেষ নয়। উপরে যে মন্দিরটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি তৈরি হয়েছে অনেক পরে।
১২৪১ বঙ্গাব্দ। বাংলা ক্যালেন্ডার বলছে সেটা ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দ। ইংরেজ শাসনের তখনও সবে পঞ্চাশ বছর পেরোয়নি। বাংলার রাজনীতি অস্থির। চারদিকে ঠাকুর-দেবতার নতুন নতুন মন্দির গড়ে উঠছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই শক্তিবাড়ির কোনো জমিদার বা ধনাঢ্য ব্যক্তি—ঠিক জানা যায় না কে—সিদ্ধান্ত নিলেন, এই প্রাচীন শিবলিঙ্গকে ঢেকে দেবেন মন্দির দিয়ে। তৈরি হলো আজকের কপিলেশ্বর শিব মন্দির।
যদি তোমরা কখনো যাও, ছাদের কারুকাজ আর দেওয়ালের নকশা দেখে আসো। বাংলার সাধারণ হাতের কাজ নয়, কিছুটা মোগল প্রভাবও আছে। কেউ কেউ বলেন, মন্দিরের গায়ে যে পাতাবাহার আর জ্যামিতিক নকশা, তা মুর্শিদাবাদের রাজবাড়ির আদলে তৈরি। সম্ভব।
ভেতরের ছবি আর পরিবেশ
মন্দির চত্বরটা বেশ ছোটো। সামনে ঢলে পড়া বারান্দা। পাশে একটি পুরনো বটগাছ। নীচে পাথরের চাতাল। কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভাঙা। বর্ষার জলে কিছু জায়গায় সবুজ শেওলা জমে যায়। সন্ধেবেলায় শান্ত। কোনো প্যান্ডেলের চিৎকার নেই। ঘণ্টা বাজে শুধু একবার—সন্ধ্যা আরতিতে।
ভিতরে শিবলিঙ্গের গায়ে জড়ানো থাকে বেলপাতা আর ধুতুরার ফুল। পাশে কিছু ছোট ছোট মূর্তিও রক্ষিত আছে। পাথরের তৈরি সরস্বতী, বিষ্ণু, এবং একটি ক্ষয়িষ্ণু নারীমূর্তি। দারুণ মন ভালো করার জায়গা।
এখন আমার মনে পড়ছে—আমি যখন প্রথম কলকাতা থেকে চাকরিসূত্রে মুর্শিদাবাদ আসি, তখন বন্ধু বলেছিল, "শক্তিপুরে এক মন্দির আছে, ওখানে গেলে আজব অনুভব করবি।" কথা মতো গিয়েছিলাম এক শনি সকালে। সত্যি, মনে হচ্ছিল ঘড়ির কাঁটা পেছনে ঘুরছে। পুরনো দিনের সেই শান্ত নিস্তব্ধতা এখনো জমে আছে দেয়ালে দেয়ালে।
স্থানীয় মানুষের মুখের গল্প
টিকিট কাটতে হয় না। নেই কোনো মোটা ভিড়। বরং আশপাশের কিছু বুড়ো মানুষ বসে থাকেন চাতালে। তাঁদের সঙ্গে কথা বললেই জানতে পারবেন গভীরের কথা।
শুনলাম, এক সময় এই জমি ছিল গোস্বামীদের। তাঁরা দীর্ঘকাল ধরে পুজো যত্ন করতেন। শিবরাত্রিতে আয়োজন হতো জমজমাট। এখন সরকারি বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চলছে, তবে নিয়মিত পুজো হয় প্রতিদিন সকালে-সন্ধ্যায়।
এক বৃদ্ধ ভক্ত বললেন—"বাবু, এই পাথর ছুঁলে সাড়া মেলে। মানুষের বিশ্বাস, কপিল মুনি স্বয়ং এই শিব তৈরি করেছিলেন কৌরব-পাণ্ডবের যুগে।"
ঠিক ইতিহাস তা বলে না। কিন্তু কে যায় বলতে? মানুষের মন যদি বিশ্বাস পায়, মুশকিল কী?
আমরা আরও জানলাম, মন্দিরের পাশ দিয়ে একসময় বয়ে যেত ছোট খাল। শিবের অভিষেকের জল সেখানে যেত। এখন খাল ভরাট, আছে শুধু ময়লা জমা জল। কষ্ট হয় দেখলে।
আজকের বাস্তবতা
সত্যি কথা বলতে, কপিলেশ্বর শিব মন্দির আজ মোটেও ফুটফুটে নয়। যদি প্রত্ন বিভাগের কোনো আধিকারিক না আসেন, এখনো নজর কাড়ার মতো বিশেষ ব্যবস্থা নেই। দালানের বেড়ায় আর্দ্রতার দাগ। রঙ উড়ে গেছে। কোথাও কোথাও ইট ফেটে গেছে। গাছের শিকড় পুরনো দেওয়ালের ফাটল ধরে নেমেছে সিঁড়ি বেয়ে।
কিন্তু তবুও এই মন্দির আজও বেঁচে আছে। না, কোনো বড় হোটেলের পাশে বসে না। নেই কোনো বিপণি বিতান। তবু প্রতি প্রাতে ওই নিস্তব্ধতায় ঘণ্টা বাজে, আর শিবের পাথর ঠাণ্ডা থাকে ফোটানো জলে।
একা এক ভক্ত হয়তো আসে। মাথায় তেলদা চুল। হাতে ফুলের মালা। এক পয়সা ভিক্ষা দেওয়া বৃদ্ধা মন্ত্র পড়ে বসে থাকে চাতালের এককোণে। বটগাছের নিচে অল্প আলো পড়ে। সন্ধে নামলে পাখি ফিরে আসে বাসায়।
এই হলো কপিলেশ্বর শিব মন্দির। কোনো বড় রাস্তার ধার ঘেঁষে না দাঁড়ানো। বরং বেলডাঙার ইতিহাসের পাতার ভাঁজে গেঁথে থাকা। তাকালে চোখে পড়ে না। খুঁজলে দেখা যায়।
আমাদের দায়িত্ব
এমন সময়ের সাক্ষী মন্দিরের এখন হাল কী করছি আমরা? কিছু করছি তো? সত্যি বলতে, নেই কোনো বড় পর্ষদ। না আছে তেমন সংরক্ষণ প্রকল্প। একমাত্র স্থানীয় কতক মানুষ, কতক সাধু ভক্ত, যারা নিজেদের পয়সায় দীপ জ্বালান, সিঁড়ি মেরামত করেন, বা নিয়ম মেনে পুজো চলিয়ে দিচ্ছেন।
তাই মনে হয়, আজই যদি তুমি মুর্শিদাবাদ যাও, বেলডাঙার ইতিহাস হাতে চেপে ধরতে চাও, তবে শুধু ডুমনিতলা নয়—শক্তিপুরও যেও। দুধ কলার সঙ্গে মাথায় করে নিয়ে যেও শিশুকে। দেখাবে ইতিহাস। গল্প বলবে সময়ের।
কপিলেশ্বর মন্দির ততটা দাপুটে নয় যে জাহির করবে, 'দেখছো আমি কত বড়'। বরং চুপচাপ রয়ে গেছে নিজের মতো। পাশের রাস্তার ধুলো উড়ছে। শিবলিঙ্গের চোখ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে দিনরাত্রি। তার হাজার বছরের পুরনো কাহিনি ফিসফিস করে শোনাতে কেউ এলে সাদর আমন্ত্রণ জানায়।
কিন্তু সেটা হয় তো কোনো এক শনি-মঙ্গলবার, গোধূলি বেলায়। আর যদি সেই সময়ে পৌঁছে যাও, তবে হয়তো শিবের পাথর স্পর্শ করে মনে হবে—আমরা কত ছোট ওদের চেয়েও। আর ইতিহাস বলে যায়—'আমি আছি, তবু থাকব। স্মৃতির মতো, শিকড়ের মতো।'
শেষকথাটা শুধু এটুকুই যে বেলডাঙার আমি-আপনি, যারা ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখতে চাই, তাদের কথা একটু ভাবা দরকার। আজ না ভাবলে, কাল এই কপিলেশ্বরও হয়তো শুধুই একটি নাম হয়ে যাবে—পাঠ্যবইয়ের পাতায়। আর এটা যেন না হয়।
তাই আজই পরিকল্পনা করে ফেলো। দিন ঠিক করো। শক্তিপুরে যাওয়া। কপিলেশ্বরের পাথর হাত দিয়ে দেখো—যে পাথরে লিখে আছে, ৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের শীতের এক সকালে, কে যেন প্রথম প্রণাম করেছিল এই শিবলিঙ্গকে। আর সেই পুণ্য, সেই ইতিহাস, আঁকা হয়ে রয়েছে শিবের চিরশীতল হাতে।
শ্যাম বরণ শিবলিঙ্গ। গঙ্গার জল পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। আর শুধু তুমি এবং সময়ের নীরবতা। সময় থামে। নিঃশ্বাস ভারী হয় শ্রদ্ধায়।
তাই যেও। আর জানিও, কেমন লাগলো।
- Get link
- X
- Other Apps
- Get link
- X
- Other Apps
Comments
Post a Comment