বুড়িমাতা মন্দির: বেলডাঙার বুকে লাল পাটির ঠাকুরাণী
বেলডাঙা শহরের মাঝখানে দাঁড়ালে, চারদিকে শুধু গাড়ির শব্দ। দোকানের সাইনবোর্ড। চায়ের স্টল। মানুষের ভিড়। গরমের দুপুরে ধুলো উড়ছে। অথচ একটু বাঁক নিলেই, যেন অন্য এক জগতে পা বাড়ালে।
আমি কথা বলছি বুড়িমাতার মন্দিরের কথা।
অনেকেই বলেন, বেলডাঙার প্রাণ যদি কোথাও স্পন্দিত হয়, সেটা এই মন্দিরের চাতালেই। কারণ শহর বদলায়। চেহারা বদলায়। ইট-পাথরের দোকান গজায়। মানুষ পাল্টায় চেনা-জানা। কিন্তু বুড়িমাতা ঠিক একই রকম থাকেন। রোজ সকালে তাঁর ঘুম ভাঙে মৃদু ঘণ্টাধ্বনিতে।
শহরের ফুসফুস যদি কিছু হয়, তবে তা এই মন্দির
প্রায় সব পুরনো বাঙালি শহরের গল্পের মতো, বেলডাঙাও একসময় গড়ে উঠেছিল নদী, বাজার আর মন্দিরকে কেন্দ্র করে। সেই আদি বেলডাঙা আজ অস্তিত্ব হারিয়েছে অনেকটাই। পুরনো জমিদারবাড়ির দেওয়ালের কিছু অংশ এখন পড়ে আছে এলোপাতাড়ি। এক সময়ের বিস্তীর্ণ পুকুর ভরাট হয়ে গেছে অর্ধেক। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব না থাকলেও, বুড়িমাতা মন্দির অটুট আছে।
এটাকে আপনি সরকারি মানচিত্রের ‘বুক করা’ পর্যটনকেন্দ্র বলতে পারবেন না। এখানে গাইড মিলবে না। কোনো টিকিট কাউন্টার নেই। তবে ক’জন বেলডাঙার মানুষকে জিজ্ঞেস করুন, “মন্দিরের ঠাকুরাণী কেমন?”—তাঁরা চোখ বড় করে বলবেন, “উনি আছেন বলেই তো শহর আছে।”
ভয়ঙ্কর রকমের অগ্রাহ্য করা যায় না এই বিশ্বাসকে।
‘বুড়ি’ কেন? নামের পেছনের গল্পটা কী?
নাম শুনেই প্রথম প্রশ্ন আসে—ঠাকুরাণীর বয়স কত? কেন ‘বুড়ি’ ডাকবেন মা বলে?
কোনো লিখিত ইতিহাস বলে না স্পষ্ট করে। মুখে মুখে ফেরে নানা কথা। বেশি প্রচলিত গল্পটা হলো— অনেকে বলেন, বহু বছর আগে এই জায়গায় ঘন জঙ্গল ছিল। স্থানীয় পথিকরা ভয় পেতেন অন্ধকার হলে। একদিন এক বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনী হাজির হলেন এখানে। তিনি একটি পাথরের মূর্তি স্থাপন করলেন। বললেন, “আমি এখানেই থাকব। যারা ভক্তিভরে আসবে, তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করব।”
লোকেরা তাঁকে দেখত ‘বুড়ি মা’ নামে। কালক্রমে সেই সন্ন্যাসিনী আত্মস্থ হলেন মূর্তিতে। তখন থেকে তিনিই বুড়িমাতা। পাকা গায়ের রং। হাতে কী যেন। দীপ্ত একটা শান্ত চোখ।
কেউ কেউ আবার বলেন, এটি আদতে সতীপীঠ নয়, কিন্তু অসংখ্য সাধুর তপোবনে পবিত্র হওয়া এক শক্তিপীঠ। মানুষ যা বিশ্বাস করে, তাই শেষ কথা। তাই আর তর্ক না করে ফেলি। বুড়িমাতা আছেন—এটাই বড় কথা।
চলো ভিতরে যাই
মন্দিরের ফটকটা মোটেই বড় নয়। ঢুকেই ডানদিকে, কিছুটা নিচু চাতালে, একটি পুরনো বটগাছের ছায়া মিলেমিশে আছে। গাছটার বয়স কেউ বলে ২০০ বছর, কেউ বলে আরও বেশি। গায়ে বয়সের দাগ। ঝুরিগুলো চলে গেছে মাটির ভেতর, আবার বেরিয়েছে। কিছু ঝুলের সাথে বাঁধা লাল-পীতাম্বরের উড়ানো টুকরো।
মূল মন্দিরটা বেশ ছোট। পাকা ইটের গাঁথুনি। চুন-সুরকির আস্তর আজও কিছু জায়গায় টিকে আছে। রং হয়তো একবার নীল ছিল। এখন গাঢ় লালচে-মাটির টান। চূড়ার ঢালু ছাদ একটু চ্যাপ্টা হয়ে গেছে নজরে পড়ার মতো। ঠিক ‘বাংলার চালা’ স্টাইলে তৈরি নয়, তবু কিছুটা মোগল-বাংলা মিশ্রণ আছে।
ভিতরে গেলে ঘন অন্ধকার। চারপাশে তেলের প্রদীপের আলো। তার মধ্যে স্থির নিস্তব্ধতায় শুধু মৃদু সিঁথির সুর। মায়ের প্রতিমা বেশ বড় নয়, হাতের কাছে মনে হবে আপনজন। মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। ধূপের ধোঁয়া চোখে জল এনে দেয়, আবার মন পরিষ্কার করে দেয়।
মানুষের গল্প, মন্দিরের নিঃশ্বাস
বুড়িমাতার মন্দিরে পা রেখেই বুঝবেন, এখানে কোনো ‘ট্যুরিস্ট’ নেই। আছেন শুধু ভক্ত। তাদের কাহিনি আপনাকে গলা টিপে ধরে।
যেমন ধরো সোমা দিদির কথা। স্থানীয় স্কুলের শিক্ষিকা তিনি। বছর দশেক আগে তাঁর ছেলের বোর্ড পরীক্ষা। সারা বছর পড়ায় মন বসত না। বাড়িতে টেনশনের বাতাবরণ। এক neighbour তাঁকে বলল, “একবার বুড়িমাতার কাছে কথা বলো।”
সোমা দিদি গেলেন। মায়ের সামনে মাথা ঠেকালেন। কিছু বললেন না, শুধু চোখ বুঁজে প্রার্থনা করলেন। ফিরে এসে দেখলেন, ছেলের পড়ায় খানিক মনোযোগ বাড়ল। না, আকাশ-পাতাল তফাত হয়নি। তবে যেন এক অদৃশ্য হাত রেখে দিল। ছেলে পাশ করল। এখন সে চাকরি করে। সেই থেকে প্রতিবছর সোমা দিদি শিবরাত্রিতে নৈবেদ্য দিয়ে যান।
এমন আরও অগুন্তি গল্প ছড়িয়ে আছে এলাকায়। কারও সংসার জমল। কারও দোকান চলল। কেউ বিদেশ যাওয়ার আগে মানত করে, ফিরে এসে মাথা ঠেকায়। কেউ সন্তান না হলে এক বছর সোমবার জলা খিচুড়ি বিতরণ করে। বলা হয়ে থাকে, অসম্ভব কিছু চাইলে বুড়িমাতার কাছে চুপটি করে থাকতে হয়—কথা না বলে। ওনি সব শুনতে পান।
সত্যি? জানি না। কিন্তু বিশ্বাস আশা দেয়। বিশ্বাস মানুষকে শক্তি দেয়। আর তাই হয়তো আজও মন্দিরের বেন্টো বাক্স ভরপুর থাকে।
বছরের বিশেষ দিনগুলো
শনি ও মঙ্গলবার এখানে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। বিশেষ করে বাংলা বৈশাখের শেষের দিকে একদিনে মেলা বসে। সেই সময় ভক্তেরা নারকেল নিয়ে মায়ের সামনে ভাঙে, প্রদীপ জ্বালায়। ছোট ব্যবসায়ীরা স্টল দেয়। ফুচকা, চাটনি, খেলনা, চুড়িওয়ালা—সব মিলিয়ে তো খুব জমে ওঠে গ্রামীণ মেলার রেশ।
আর এক উৎসব হচ্ছে শিবরাত্রি। কারণ বুড়িমাতা শিবর সঙ্গে যুক্ত? বেশিরভাগ ভক্ত বলেন, মা শিবের স্ত্রী রূপেই পূজিতা হন। আবার কারও মতে উনি কালীরই এক মৃদু রূপ। তর্কে না গিয়ে, আসল কথা এই উৎসবে মন্দির চত্বর সাজানো হয় আলপনা দিয়ে। লাল পায়ের ছাপ আঁকা হয় ফটক থেকে চাতাল পর্যন্ত। মায়ের গায়ে সিঁদুর আর ফুল। মধ্যরাতে আরতি হয় ঘণ্টা-কাঁসর শব্দে। সেদিন বেলডাঙার ঘুম ভাঙে না, বরং গ্রাম জেগে থাকে মায়ের গানে।
আমার দেখা বুড়িমাতা
এখন আমি কি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলব? ঠিক আছে, গত বছর পড়ন্ত বিকেলে গিয়েছিলাম মন্দিরে। দারুণ গরম, বটের নীচে হাঁ করে বসে আছি। দেখি এক বৃদ্ধ লোক মায়ের সামনে বসেছেন। ভাঙা গলায় নিভৃতে বলছেন, “মা, এবার ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার করো।”
বুঝলাম কোনো পারিবারিক জট। তিনি বোধহয় সংসারের কাহিনি ফিসফিস করছেন মায়ের কানে। চোখে জল ঝলমল করছে তাঁর।
আমি দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম। এরকম অনেকগুলো মূহুর্ত সেখানে আমি দেখেছি। ভাষাহীন প্রার্থনা। নীরব অশ্রু। কখনো উৎকণ্ঠা, কখনো শান্তির নিঃশ্বাস। কবে এই মন্দির তৈরি হয়েছে, কে নির্মাণ করেছিলেন—তার চেয়েও বড় সংবাদ হলো, এখানকার প্রতিটি ইট ভিজেছে মানুষের আবেগে। প্রতিটি ধাপ ডুবে গিয়েছে কান্না আর আশায়।
পাথর ঠান্ডা হয় ভালোবাসায়। বিশ্বাসে। আর তাই ইতিহাসবিদ না হয়েও আমরা জানি, বুড়িমাতার বয়স যতই হোক, তাঁর মাহাত্ম্য নির্ভর করে একান্তই আজকের ভক্তের মননের ওপর।
আমার শেষ কথা
তোমাদের বলছি, তুমি যদি বেলডাঙা যাও, শুধু ঘুরে দেখবে—একটু থেমো। চায়ের দোকানে বসে দিক জিজ্ঞেস করো। পৌঁছে যাবে বুড়িমাতার আঙিনায়। আদর করে ডাকবে—‘ওই যে মন্দির, সামনে’। ঢুকে লাল সিঁদুর ছোঁয়াও একটু। অন্ধকার ঘরে স্থির হও কয়েক মুহূর্ত।
শ্রদ্ধা জানাও। নয় তো ফিরবে খালি হাতে। তবে বিশ্বাস করো, এক শান্তির নিশ্বাস রেখে আসবে। শুধু ভক্তি — কোনো মূল্য নেই যার। আর ঠিক বুড়িমাতা সেটাই চান।
উনি বুড়ি। উনি আদুরে। উনি সহজ। তাহলে এলেই তো হয়!
যাইহোক, আশা করছি একদিন হাজির হবে বুড়িমাতার সাক্ষাতে। শুধু টিকিট লাগবে না, লাগবে একটু ভালোবাসা আর বিশ্বাসের মোটা দাম। আর বেলডাঙার নাম বলতে গেলে বুড়িমাতাকে ছেড়ে কথা বলাটা অসম্পূর্ণ থাকবে।
জয় বুড়িমাতার। জয় বেলডাঙার।
Comments
Post a Comment