মা ডুমনি তলা নওপুকুরিয়া: ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব মিলনস্থল
মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙা ব্লকে অবস্থিত ‘মা দুমনি তলা নওপুকুরিয়া’ শুধু একটি মন্দির নয়; এটি যেন ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা আর গ্রামবাংলার অমায়িক আবহের এক অপূর্ব মিলনমেলা। দেবী ডুমনি বা ডোম্বিনী নামটি তন্ত্রসাধনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনি আর বিলের জলে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের সন্ধান আজও কৌতূহলী করে তোলে দর্শনার্থীদের। কয়েক শতাব্দী প্রাচীন এক প্রকান্ড বটবৃক্ষের নীচে, হিজল গাছের অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা হয়ে বসে আছে দেবী ডুমনি। ফেসবুক পেজ ‘মা ডুমিনি তলা-নওপুকুরিয়া’-তে চোখ রাখলেই চোখে পড়ে এই মায়াবী পরিবেশের কিছু অসাধারণ ছবি ও ভিডিও, যেখানে গাছের ছায়া ও আলোর খেলা দর্শককে মুগ্ধ করে।
অবস্থান ও বর্ণনা
প্রাচীন গৌড়ের খুব কাছাকাছি, বাগড়ি অঞ্চলের ডুমনীদহ বিলের পাড়ে নওপুকুরিয়া গ্রামে এই মন্দিরটির অবস্থান। মন্দিরটি যেন সময়ের আবর্তনে অবিচল। চারদিকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এলাকার ভিতরে একটি চাতালের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এই প্রাচীন বটবৃক্ষ। গাছটির ঝুরিগুলো এতই বড়ো যে, অনেক দূর থেকে দেখলে মনে হবে গাছটি শিকড়ের জালে আচ্ছন্ন, সবুজের সার্বভৌমত্ব যেন এখানে অটুট।
বটগাছের নীচে চাতাল সংলগ্ন একটি ছোট্ট ঘরেই দেবী ডুমনী মায়ের মূর্তি অবস্থিত। এক চালি বিশিষ্ট প্রায় এক ফুট উচ্চতার কোষ্টি পাথরের এই মূর্তি। দেবীর মাথার চালিতে রয়েছে ধ্যানরত বুদ্ধমূর্তি, যা ইঙ্গিত দেয়, এই মূর্তিটি বৌদ্ধ যুগের, অর্থাৎ পাল বা সেন যুগের। এখানে আরও রয়েছে একটি কালো কোষ্টি পাথরের বিষ্ণুমূর্তি, একটি ভাঙা নারীমূর্তি এবং একটি সাদা বেলে পাথরের আরেকটি ধ্যানরত ডুমনী মায়ের মূর্তি।
অনেকে এই মূর্তিটিকে বৌদ্ধ ‘তারা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, আবার কেউ কেউ মনে করেন তিনি আদ্যাশক্তি মহামায়া। তবে ভক্তির বিচারে কোনো বিভাজন নেই—ভক্তেরা পরম শ্রদ্ধায় দক্ষিণা কালীর ধ্যানে দেবী ডুমনীকে পূজা করেন। মন্দিরের পাশেই রয়েছে একটি খেয়াঘাট, যা নওপুকুরিয়াকে ওপারের আন্ডিরন গ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এখানকার মানুষজনের চলাফেরার প্রধান মাধ্যম এই খেয়াঘাট, যা গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য
ডুমনীদহ বিলের জল থেকেই এই সব মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। তবে কবে, কে বা কারা এই মূর্তিগুলি উদ্ধার করেছিলেন, তা নিয়ে নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারেন না। কোষ্টি পাথরে খোদিত মূর্তিগুলি সেন বা পাল যুগের সমসাময়িক বলে গবেষকদের ধারণা, যা এই মন্দিরের প্রাচীনত্বের আরও প্রমাণ।
এক সময় বেলডাঙা পড়ত নাটোরের জমিদারি সীমানার ভেতরে। পরে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত আশপাশের ১,১৬১ বর্গমাইল নিয়ে এই এলাকা মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী পরিবার জগৎ শেঠদের খাসতালুকে পরিণত হয়। নবাব আলিবর্দি খাঁর শাসনকালে বাংলার গ্রামেগঞ্জে যখন বর্গি আক্রমণের রেশ ধরে ‘ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এল দেশে’—এই দুঃস্বপ্নের গান গাওয়া হত, সেই সময় থেকেই এই অঞ্চলের মানুষের ইতিহাসের পাতায় জুড়ে আছে নানা ঘাত-প্রতিঘাত। সেই স্মৃতি আজও মা ডুমনির মন্দিরকে ঘিরে থাকা আখ্যানের অঙ্গ।
পূজা ও উৎসব
শনি ও মঙ্গলবার এখানে বিশেষ পূজা হয়। জেলার বাইরে থেকেও বহু ভক্ত ভিড় করেন দেবীর দর্শন ও অভীষ্ট সিদ্ধির উদ্দেশ্যে মানত করতে। বৈশাখ মাসের প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এক মাস ধরে বসে মেলা, যেখানে গ্রামীণ হাটের মতো জমজমাট পরিবেশ বিরাজ করে। ভক্তেরা পরম ভক্তিভরে ডুমনী মায়ের কাছে মানত করেন, পূজা দেন এবং নিজেদের ভক্তি নিবেদন করেন। সেই সময় মন্দিরের চত্বর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
মা ডুমনি মন্দির ঘিরে বাঙালির লোকসংস্কৃতির নানা রূপ ছড়িয়ে আছে। যেমন- গ্রামীণ মেলা, পূজা-অর্চনার রীতি, আর সাধুসন্তদের আগমন। বিপুল ভক্ত-সমাগম ও নানান আয়োজন, সব মিলিয়ে গ্রামীণ জমজমাট এক পরিবেশের সৃষ্টি করে। এখানে শ্রী কৃষ্ণ ও রাধার কীর্তন গাওয়া হয়, ভক্তরা ‘হরে কৃষ্ণ’ মন্ত্র জপ করেন, যা ভক্তির রসে সিক্ত করে তোলে মন্দিরের চারপাশ।
লোকসংস্কৃতি ও আজকের প্রাসঙ্গিকতা
শুধু পূজার জন্যই নয়, নওপুকুরিয়া ও ডুমনিতলা বর্তমানে দর্শনার্থী ও পর্যটকদের কাছেও একটি আকর্ষণীয় স্থান। ইতিহাস ও প্রকৃতি—দুইয়ের মেলবন্ধন এখানে অনন্য। ডুমনিতলা থেকে খুব কাছেই রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম, আদমগাদম ও বিন্দুবাসিনীতলা—ঘুরে দেখার মতো আরও কিছু প্রাচীন ও ধার্মিক স্থান। তাই মায়ের পূজা সারার পর আশপাশের এই দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার রেওয়াজ রয়েছে বহু পর্যটকের।
নওপুকুরিয়া ডুমনিতলা আজও প্রমাণ করে, গ্রামবাংলার প্রাণ হলো তার আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলো, যা শতাব্দী ধরে বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। এখানকার উৎসব-পার্বণ, গ্রামীণ মেলা ও সরল মানুষের ভক্তির ঢল চিরকালীন এক বাণী বহন করে——জল স্থির থাকে না, সময় বয়ে যায়; কিন্তু ভক্তি আর ইতিহাসের স্রোত কখনও পুরোনো হয় না।
এই মন্দির আজ সাক্ষী হয়ে রয়েছে বহু পুরোনো ইতিহাসের। দেবীর মূর্তিতে পড়ে থাকা বুদ্ধমূর্তি থেকে শুরু করে, বিগ্রহের আঙ্গিক, কোষ্টি পাথরের ব্যবহার কিংবা আশপাশের প্রত্নস্থল—সব মিলিয়ে নওপুকুরিয়া ডুমনিতলা যেন এক জীবন্ত প্রত্নজাদুঘর।
উপসংহার
‘মা দুমনি তলা নওপুকুরিয়া’ একাধারে তান্ত্রিক সাধনার পীঠস্থান, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভান্ডার আর অপার শান্তির আঁধার। মুর্শিদাবাদের ইতিহাস আর বাগড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ এটি। গণমানুষের আন্তরিক ভক্তি ও শ্রদ্ধা আজও এই মন্দিরকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
যদি মন কাড়ে ইতিহাস, আর যদি প্রাণ চায় একটু শান্তি, তবে একবার চলে আসতে পারেন মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার এই প্রান্তে। সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখবেন, শতাব্দী প্রাচীন বটবৃক্ষের ছায়ায় দেবী হাসছেন চিরশীতল আবেগে। আর ভক্তদের কীর্তনের সুর যেন মায়ের নাম জপ করছে বারংবার——‘জয় ডুমনি মা’।
Comments
Post a Comment